আমার বাচ্চা “ক্লাব ফুট বা মুগুর পা” নিয়ে জন্মেছে – ভাল হওয়ার উপায় কি??

Dr. Qaisur Rabbi

ক্লাবফুট (মুগুর পা নামেও পরিচিত) একটি প্রচলিত জন্মগত পায়ের বিকৃতি যেখানে পাগুলো জন্মগতভাবে ভেতরের দিকে এবং নিচের দিকে বাঁকা হয়ে থাকে। এই ত্রুটি সাধারণত ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায় এবং এক বা উভয় পায়েই এই ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই এটা শরীরের একমাত্র জন্মগত ত্রুটি হিসেবে দেখা গেলেও অনেক সময় অন্যান্য ত্রুটির সাথে ও এটি দেখা যায় যেমন আর্থ্রোগ্রাইপোসিস মাল্টিপ্লেক্স কনজেনিটা, জন্মগত হিপ জয়েন্ট ত্রুটি (DDH) অথবা চারকোট ম্যারি টুথ ডিজিজ নামক কঠিন রোগের সাথে। বাচ্চার পায়ে শুধুমাত্র ক্লাব ফুট থাকলে সেটাকে ইডিওপ্যাথিক ক্লাব ফুট বলা হয়। কিন্তু ক্লাব ফুটের সাথে অন্যান্য শারীরিক অসামঞ্জস্যতা থাকলে সেটাকে সিন্ড্রোমিক ক্লাবফুট বলা হয়। সিন্ড্রোমিক ক্লাবফুটের চিকিৎসা সাধারণ ক্লাব ফুটের তুলনায় একটু জটিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বড় অপারেশনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়ে আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে পায়ের এই গঠনগত ত্রুটি নিরূপণ করা সম্ভব হলেও এর কারণ সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। তবে জন্মানোর পর পরই চিকিৎসা শুরু করলে খুব সহজে এবং কম খরচে পায়ের এই গঠনগত ত্রুটি প্লাস্টার এর মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে অনেক সময় হাড্ডি ও রগের বড় অপারেশন করতে হয়।
কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাদের পা ক্লাব ফুটে আক্রান্ত বাচ্চাদের পায়ের মতো কিছুটা বাঁকা পরিলক্ষিত হলেও সেটার জন্য কোন প্লাস্টার বা চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। সাধারণত ক্লাব ফুটের এই ধরনটিকে পোস্চারাল ক্লাব ফুট বলা হয়। একজন অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ খুব সহজেই বাচ্চাদের পা পরিক্ষা করে এই ধরনটিকে বাকি সব ক্লাব ফুটের থেকে আলাদা করতে পারেন।
কিন্তু যদি বাচ্চার চিকিৎসা ৬ মাস বা তারও পরে শুরু করা হয় সে ক্ষেত্রে অনেক সময় প্লাস্টার করে পা সঠিকভাবে ঠিক করার স্বার্থে বাচ্চাকে অবশ বা অজ্ঞান করার প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে গোড়ালির পেছনের দিকের রগটিকে লম্বা করার (টেনোটমী) প্রয়োজন হতে পারে যা কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে (৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের) সামান্য ইনজেকশনের মাধ্যমে জায়গাটিকে অবশ করে করা সম্ভব। তবে শেষ প্লাস্টার এর সময় বাচ্চার বয়স যদি ছয় মাসের বেশি হয় সে ক্ষেত্রে বাচ্চাকে পুরোপুরি অজ্ঞানের প্রয়োজন হতে পারে।
প্লাস্টার এর মাধ্যমে ক্লাবফুট নামক পায়ের গঠনগত ত্রুটি খুব সহজে এবং অল্প সময়ে ( দুই মাসের মধ্যে) ঠিক হয়ে গেলেও এর চিকিৎসা চলমান থাকে চার থেকে সাড়ে চার বছর পর্যন্ত। পা থেকে প্লাস্টার খোলার পরে পায়ে বিশেষ জুতা পরানো এবং ডাক্তারের পরামর্শমতো দিনে নির্দিষ্টসংখ্যক বার পায়ের ব্যায়াম করানো, সফল চিকিৎসার জন্য অতীব জরুরি। যে সকল বাবা-মা নিয়মিত বাচ্চার পায়ের ব্যায়াম করান না বা বিশেষ জুতা পড়ার ব্যাপারে অবহেলা করেন, সেসব বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ক্লাব ফুট নামের পায়ের বিকৃতি পুনরায় ফেরত আসার সম্ভাবনা বা হার বেশি।
কিছু কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১। ক্লাব ফুট এর চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায় তত ভালো। দেরিতে ক্লাব ফুটের চিকিৎসা শুরু করলে ত্রুটি সারানোর জন্য অনেক সময় বড় অপারেশন বা ক্ষেত্রবিশেষে হাড্ডিতেও অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
২। চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্রেস বা বিশেষায়িত জুতা পরা।
৩। ব্রেস বা বিশেষায়িত জুতাটি বাচ্চার পায়ে ঠিক ভাবে ফিট হয়েছে কিনা সেটি চিকিৎসকের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া।
৪। ব্রেসটি পায়ের তুলনায় ছোট হয়ে যাচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখা।
৫। লম্বা সময় একাধারে ব্রেস পড়ার কারণে পায়ের কোন অংশ লাল হয়ে যাচ্ছে কিনা বা চামড়ায় কোনো রকম কোনো ক্ষত সৃষ্টি হচ্ছে কিনা সেদিকে লক্ষ রাখা।
৬। অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মতো নির্দিষ্ট সময়ে- নির্দিষ্ট বার পায়ের ব্যায়াম করানো।
৭। পায়ে তেল, ক্রিম বা মলম মালিস না করা।
৮। নিয়মিত ডাক্তারের সাথে ফলোআপে থাকা এবং পায়ের গঠনগত ত্রুটির পুনরাবৃত্তি ঘটছে এমন সন্দেহ হলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *